প্রধান ভোক্তা চীনে আয় কমা ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) বিক্রি থেকে মুনাফা হ্রাসসহ নানামুখী সংকটে জর্জরিত জার্মান গাড়ি শিল্প। এ পরিস্থিতিতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রতিবেদন। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিলাসবহুল গাড়ির ব্র্যান্ড পোরশে এজি ও মার্সিডিজ-বেঞ্জ এজির রেটিং কমিয়েছে বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকটি। এতে শুধু জার্মানি নয়, পুরো ইউরোপের গাড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর ইউরোনিউজ।
প্রতিবেদনে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষক জর্জ গ্যালিয়ার্স ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের সামনে থাকা প্রধান সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে শ্রম খরচ বৃদ্ধি, শুল্কজনিত ঝুঁকি, চীনে মুনাফা কমে যাওয়া ও পরিবেশসংক্রান্ত কঠোর নিয়মাবলি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা।
তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পের জন্য ২০২৫ সাল আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বছর হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে এ খাতের শেয়ারদর এরই মধ্যে ১২ শতাংশের বেশি কমে গেছে।’
গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২৫ সালের জন্য ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের আয়ের পূর্বাভাস ৯ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের জন্য ৬ শতাংশ কমিয়েছে।
ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক যানবাহন (বিইভি) উৎপাদনের উচ্চ খরচ। গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে, ইউরোপ ও ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য জোটে (ইএফটিএ) বিইভির বিক্রয় ২০২৪ সালে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল। ২০২৫ সালে তা ১৯ শতাংশে উন্নীত হবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর কঠোর আইনের কারণে এ ধরনের গাড়ির বিক্রি বাড়বে। তবে এ থেকে পর্যাপ্ত মুনাফা অর্জন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জর্জ গ্যালিয়ার্স।
অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে গাড়ির যৌথ ব্যবসায় মুনাফা হারাচ্ছে জার্মান গাড়ি নির্মাতারা।
গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে এ মুনাফা বার্ষিক ৩৬ শতাংশ কমে গেছে। গ্যালিয়ার্স আরো জানান, ফোর্ড ও জেনারেল মোটরসও চীনে লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। ইউরোপীয় নির্মাতারাও একই অবস্থায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে স্যাকস পোরশে এসইর রেটিং ‘বাই’ থেকে ‘সেল’ করেছে গোল্ডম্যান স্যাকস। রেটিং বলতে বোঝানো হয়, একটি কোম্পানির শেয়ারের ক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য সুপারিশ। ‘বাই’ মানে শেয়ারটি লাভজনক হতে পারে এবং ‘সেল’ মানে ভবিষ্যতে শেয়ারটির দাম কমার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যালিয়ার্স পশ্চিমা বাজারে বিইভির চাহিদা কমা ও চীনে চলমান সমস্যাগুলোকে এ রেটিং কমানোর জন্য দায়ী করেন। অন্যদিকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ এজির রেটিং ‘বাই’ থেকে ‘নিউট্রাল’ (নিরপেক্ষ) করা হয়েছে। এর অর্থ কোম্পানিটির শেয়ার ক্রয় বা বিক্রি সম্পর্কে কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান।
গাড়ি শিল্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুল্ক ও বাণিজ্য সম্পর্কিত ঝুঁকি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি চীনে তৈরি বিইভির ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনকে ব্যাহত করতে পারে। গ্যালিয়ার্স বলেন, ‘গাড়ি শিল্প একটি বৈশ্বিক খাত। শুল্ক বাড়ার কারণে বেশির ভাগ কোম্পানিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’
তবে কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও গোল্ডম্যান স্যাকস ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পে রেনোঁকে সম্ভাবনাময় কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফরাসি কোম্পানিটি ব্যয় সাশ্রয়ে সফল হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু নতুন গাড়িও বাজারে এনেছে। এটি জার্মান নির্মাতাদের তুলনায় অস্থির বাজার পরিস্থিতিতে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে বলে মনে করছে গোল্ডম্যান স্যাকস।
গ্যালিয়ার্স বলেন, ‘এক দশক ধরে গাড়ি শিল্প দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে ইউরোপীয় নির্মাতাদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার।’